আজ আমরা গা ঘিনঘিন করা কেঁচো দিয়ে উন্নত জৈব সার পাওয়ার আশায় কেঁচো ফার্ম (ভার্মিকম্পোস্ট) করছি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সার্বিক সহায়তায় প্রায় ৫৯ কোটি টাকার ফ্রগ হ্যাচিং প্রজেক্ট (ব্যাঙ চাষ প্রকল্প) হাতে নিচ্ছি। অনেক আগেই শুরু হয়েছে শকুন শুমারি। জৈব কৃষির প্রশ্নে এসব টিকসই কর্মকান্ডকে আমরা অবশ্যই সাধুবাদ জানাই। এসব কৃষি সহায়ক ব্যবস্থা নিঃসন্দেহে কীটনাশকের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। প্রকৃতির কোন কিচ্ছুই ফেলনা নয় কিন্তু কৃষির তৃণমূল পর্যায়ে প্রতিনিয়ত নির্দ্বিধায় নির্বিচারে বিষাক্ত কীটনাশক প্রয়োগ করে আমরা সমস্ত পরিবেশ ও প্রতিবেশের সমূহ ক্ষতি করছি। ফসলের ক্ষতির কোন পর্যায়ে, কোন বালাইনাশক, কি পরিমাণে প্রয়োগ করতে হয়, সে বিষয়েও চাষির তেমন কোন ধারণা নেই। আবার আইপিএম (ইন্ট্রিগ্রেটেড পেস্ট ম্যানেজমেন্ট) তথা জৈব বালাইনাশক ও মেকানিকাল মেথডের কোন চর্চা না করেই ফসলে পোকার আক্রমণে ভাবনায় দিক্বিদিক হয়ে দৌড়ে যাচ্ছি বালাইনাশকের দোকানে– রেডিমেড বিষাক্ত পেস্টিসাইডের প্যাকেট এনে তা ক্ষেতে প্রয়োগ করছি।
সম্প্রতি সরকার প্রায় চার হাজার আইপিএম ক্লাবের মাধ্যমে ৯৭ হাজার ৫০০ জন চাষিকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সমন্বিত বালাই দমন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্রকল্প এলাকায় প্রায় ৮০ থেকে ৯০ ভাগ কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে আনার কাজ শুরু করেছে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে জৈব খাদ্য উৎপাদনে আইপিএম ব্যবস্থার কোন বিকল্প নেই। আইপিএম বা সমন্বিত বালাই দমন ব্যবস্থাপনা হলো পরিবেশ দূষণমুক্ত রেখে প্রয়োজনে এক বা একাধিক দমন ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে ফসলের ক্ষতিকর পোকামাকড় ও রোগবালাইকে অর্থনৈতিক ক্ষতি সীমার (ইকোনোমিক থ্রেশহোল্ড লেভেল- ইটিএল) নিচে রাখা। আইপিএম পদ্ধতিতে ফসল উৎপাদন করতে চাষিকে নিয়মিত ফসলের জমি দেখাশুনা, অধিক শ্রম ও সময়ের প্রয়োজন হয়।যেমন- পার্সিং বা ক্ষেতে ডাল পুতে দেওয়া, আলোক ফাঁদ, ফেরোমন ট্রাপ, হ্যান্ড পিকিং, নেটিং, নিম পাতার রস, নিম ও মেহগনির তেল ইত্যাদি চাষির কাছে বিরক্তিকর মনে হয়। তাছাড়া চাষি এসবের নিয়মকানুনের প্রতি তেমন ভরসাও পায় না। দুই চারটি পোকামাকড় ক্ষেতের আসে পাশে ঘুরতে দেখলেই চাষি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন- অনেক সময় চাষকৃত ফসলের কতটুকু ক্ষতি হয়েছে তা হিসেব (স্কাউটিং) করেও দেখে না। আবার ক্ষতির কারণ ঠিকমত নির্ণয়েও চাষি ততোটা দক্ষ নয়। কেবলমাত্র ক্ষেতে পোকা দেখা গেলেই হলো- যেন চাষি অনন্যোপায়, কীটনাশক প্রয়োগ করতেই হবে। আসলে সব পোকা ফসলের সব ধাপে, সব ধরনের ক্ষতি করে না। আবার পোকার সব ধাপও (অল স্টেজ) সব ফসলের জন্য সমস্যার কারণ নয়। অনেক পোকামাকড় আছে যেগুলো ফসলের তেমন কোন ক্ষতি করে না বরং ফুলের পরাগায়নে সাহায্য করে এবং অন্যান্য ক্ষতিকর পোকামাকড় ধরে খায়। ফলে অ-উপকারী পোকামাকড়ের ভারসাম্য রক্ষা হয় এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি সীমার (ইকোনোমিক ইনজুরি লেভেল) অনেক নীচে থাকে। যেমন- ধান ক্ষেতে পরভোজী পোকামাকড় (প্রিডেটর) হিসেবে লেডিবার্ড বিটল, উরচুঙ্গা, ঘাসফড়িং, ওয়াটার বাগ, ড্যামসেল ফ্লাই, ইয়ারউইগ, পিঁপড়া, বোলতা, বিভিন্ন প্রকার মাকড়সা ইত্যাদি, বিভিন্ন প্রকার ডিম ও কীড়ার পরজীবী পোকা (প্যারাসাইট) হিসেবে বোলতা বা ওয়াস্প, রোগজীবাণু হিসেবে হিরসুটেলা জাতের ছত্রাকরা পাতাফড়িং ও গাছফড়িং -এ রোগ সংক্রমণ করে, নোমুরিয়া জাতের ছত্রাক মাজরাপোকা, পাতামোড়ানো পোকা, গ্রিন হেয়ারী ক্যাটারপিলার, লেদা পোকা ও চুঙ্গী পোকার কীড়া আক্রমণ করে। এসব জৈব ব্যবস্হাপনায় কীটনাশকের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার অনেকটায় সহজতর হয়।
কীটনাশকের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের বিকল্প আর কিছু নেই। যতটা সম্ভব কীটনাশকের ব্যবহার এড়িয়ে চলতে হবে। কীটনাশক ফসলের বালাইদমনে যতটা সহায়তা করে, তারচেয়ে ক্ষতিই করে বেশি। ১৯৬২ সালে রেকেল কারসন’স ল্যান্ডমার্ক থেকে প্রকাশিত ‘সাইলেন্ট স্প্রিং’ এ বলা হয়েছে, ‘পেস্টিসাইড আর টক্সিক টু লিভিং অর্গানিজম’। কীটনাশকের প্রভাবে ক্যান্সার, আলসার, হার্ট ফেইল্যুর, কিডনি বিকল, লিভার ডেমেজ, বন্ধ্যাত্ব, বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম, জীনগত সমস্যা, অটিজম শিশুর জন্ম, কোমা, এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হয়ে থাকে। ইউনাইটেড স্টেটস এনভায়রণমেন্টাল প্রোটেকশন এজেন্সির এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, A cancer causing chemical may be used despite its public health hazard if its “economic, social or environmental ” benefits are demand greater than its risk, more than 70 active ingredients known to causes cancer in animal tests are allowed for use. তাই জীবন রক্ষার্থে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বন্ধ করতে হবে।
চাই কীটনাশকের নিরাপদ ব্যবহার এবং তা অবশ্যই খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থেই চাই। তবে কীটনাশক প্রয়োগে চাষির সামগ্রিক স্বাস্থ্য সচেতনতার বিষয়টিও আমাদের বিবেচনায় আনতে হবে। নির্বোধ নিরাপরাধ চাষি তার নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে একেবারেই ‘ডোন্ট কেয়ার’। তাই নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন প্রক্রিয়া নিরবিচ্ছিন্ন রাখতে চাষিকে কীটনাশক প্রয়োগে স্বাস্থ্য সচেতনতার সমস্ত দায়-দায়িত্ব আমাদের উপরই বর্তায়। শুধুমাত্র সরকারি প্রতিষ্ঠান ডিএই’র উপর নির্ভর করে বসে থাকলেই চলবে না, সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সততায় পারে চাষি পর্যায়ে সচেতনতা বাড়াতে। কেননা, কীটনাশকের বোতল বা প্যাকেটের লেবেলে সতর্কীকরণ কয়েকটি কথা লিখে দেওয়াই যথেষ্ট নয়। এতে স্বাস্থ্য সচেতনতার কোন চিত্রও দেওয়া থাকে না। নিরক্ষর চাষির কাছে লেবেলের তেমন কোন মূল্য নেই। অক্যুপেশনাল সেফটি এন্ড হেলথ এডমিনিস্ট্রেশনের নির্দেশনা এরকম, ‘স্টপ হেলথ হ্যাজার্ড বিফোর দে স্টপ ইউ’। সেজন্য আইপিএম ক্লাবে স্বাস্থ্য সচেতনতার বিষয়টি আরো স্পষ্ট, জোরালো এবং বাধ্যতামূলক করতে হবে। ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামাদী (পারসোনাল প্রোটেকটিভ ইক্যুইপমেন্ট- পিপিই) বিষয়ে চাষিকে যথাযথ প্রশিক্ষণ, সচেতনতা এবং সহজলভ্য করতে হবে। যেমন- মাস্ক, গ্লাভস, গগলস, হেড নেট বা ক্যাপ, ফেসশিল্ড, অ্যাপ্রোন বা স্হানীয়ভাবে প্রাপ্ত ঢিলেঢালা শার্ট, প্যান্ট, গামবুট ইত্যাদি। যদি মাস্ক পাওয়া না যায় তবে গামছা, তোয়ালে, পরিষ্কার কাপড় দিয়ে নাক মুখ ভালভাবে ঢেকে নিতে হবে। মাস্ক ফাউন্ডেশন পিপিই বিষয়ে, বিশেষ করে মাস্ক ব্যবহারের চাষীকে নিরলসভাবে সচেতন করছে। আসুন, আমরা স্বাস্থ্য সচেতন হই, কীটনাশক প্রয়োগে মাস্ক পরি।
0 comments:
Post a Comment